অসম্প্রদায়িক রাজনীতির অগ্রদূত ছিলেন মঈন উদ্দীন খান বাদল

0
18

এডভোকেট সেলিম চৌধুরী

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর অবিস্মরণীয় অসাধারণ এক উক্তি ছিল “আমার বাংলাদেশের আমার মানুষেরা যার যার ধর্ম তারা নির্বিগ্নে, নিঃসংকোচে, আনন্দের সাথে পালন করিবে”। বঙ্গবন্ধুর আলোচিত এই উক্তিকে বুকে ধারণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত সোচ্চার কন্ঠে কাজ করে গেছেন অসম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ৭১ সালের এই রণাঙ্গনের সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মইন উদ্দীন খান বাদল। যখনি দেশে জাতিতে-জাতিতে বিভেদ, ধর্মে-ধর্মে বিভেদ দেখা দেয় তখনি তাঁর সোচ্চার কন্ঠে স্পর্ধিত উচ্চারণ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। এই বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা কোন স্থান হবে না।

বিগত ২০১৭ সালে যখন মায়ানমার মুসলিম রোহিঙ্গা নিধন ইস্যুতে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সাম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়, তখন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি-আকর্ষণ করে আঙ্গুল উঁচিয়ে বিরোচিত কন্ঠে বলেন- আজ জাতির কাছে আমার প্রশ্ন এই জন্যই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আমরা জীবনের ঝুকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম বাঙ্গালীর জন্য একটি দেশ করবো বলে। এই বাংলার মাটিতে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান মিলে-মিশে থাকবো বলে। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম একটি ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ করবো বলে। এই কথা গুলো সরকার শাসনতন্ত্রে সন্নিবেশ করবেন। ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম বলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। আজ এই মূলনীতির বিরুদ্ধে যদি কেউ দাঁড়ায় তাকে ছাড় নয়। প্রয়োজনে আমরা আবারো ঝাঁপিয়ে পড়বো। তবুও এই দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুন্ন রাখবো। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নাগরিক হিসেবে এই বিষয়ে আমি সবসময় সোচ্চার থাকবো।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এলাকার উন্নয়ন, দেশপ্রেমই ছিল তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রদত্ত একেকটি বক্তৃতাই যেন একেকটি অনবদ্য দলিল হয়ে রয়ে গেল সংসদ আর্কাইভে, কোটি মানুষের হৃদয়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কয়জন প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাতীয় অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করেছেন তার মধ্যে মঈন উদ্দীন খান বাদল ছিলেন অন্যতম একজন জাতীয় নেতা। তিনি শুধু একজন স্বাধীনচেতা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন বড় মাপের দার্শনিকও। তাঁর রাজনৈতিক পুরো চিন্তা চেতনার দিকদর্শন ছিল গণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, দেশের সার্বিক উন্নয়ন, জাতীয় ইস্যু গুলোতে তাঁর বীরোচিত ভাবগাম্ভীর্য পূর্ণ ভূমিকা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করত, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদীয় রীতি-নীতি পালনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এই বীর পুরুষ।

সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তথ্যবহুল দিকনির্দেশনা মূলক বক্তব্য জাতীয় সংসদ কে সমৃদ্ধ করেছে, যার প্রেক্ষিতে দশম জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদ সংসদ অধিবেশন চলাকালীন একদিন বলে ওঠেন, মাননীয় সাংসদগণ, আপনারা মঈন উদ্দীন খান বাদলকে অনুসরণ করতে পারেন। তিনি একদিকে যেমন দেশীয় রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে দেশের মর্যাদার প্রশ্নে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়, বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র/বোমা নিরস্ত্রীকরণে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষে আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, কোরিয়া, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন পারমাণবিক শক্তিধর দেশে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে বহুগুণ।

মায়ানমার সেনাবাহিনী যখন নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্বিচারে গণহত্যায় মেতে উঠেছিল তখন মায়ানমারের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বিপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতে ও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ক্রান্তিলগ্নে যখন বড় দুই দল পরস্পর বিরোধী মুখোমুখি অবস্থান নেওয়া কারণে রাজনৈতিক সংকট প্রকট হয়ে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির পাঁয়তারা হয় তখন ১৪ দল গঠন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের বীরোচিত কার্যকর ভূমিকা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

গণ মানুষের অধিকার আদায়েও সোচ্চার ছিলেন বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবীদ, ২০০৮ সালে তিনি ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনিই সর্বপ্রথম কর্ণফূলী নদীর উপর কালুরঘাট সেতু নির্মাণের গুরুত্ব ও দাবী আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে, এর পর থেকে সেতু নির্মানের দাবীতে কখনো রাজপথ, কখনো সংসদ সবখানেই সোচ্চার ছিলেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালের শুরুতে জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশন চলাকালীন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে যদি কালুরঘাট সেতু নির্মাণে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি না হয়, “আই উইল গো আউট ফ্রম দ্যা পার্লামেন্ট”।
হ্যাঁ সত্যিই তিনি তাঁর কথা রেখেছেন, ডিসেম্বরে আর তাঁকে পার্লামেন্টে যেতে হয়নি, তার আগেই ৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, চির বিদায় নিলেন পার্লামেন্ট থেকে বিদায় নিলেন দুনিয়া থেকে, মঈন উদ্দীন খান বাদলের দাবীর প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সেতু নির্মাণের নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছিলেন, এই প্রসঙ্গে সর্বশেষ গত বছরের ৭ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রী এডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন কালুরঘাট সেতু পরিদর্শনে এসে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত সভায় বলেন – এই অঞ্চলের প্রয়াত সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদলের প্রস্তাবিত কালুরঘাট সেতু হবেই, এটি আরো বছর দুয়েক আগে হয়ে যেত কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কিছু ভুল ত্রæটির কারণে হয়ে উঠেনি। যার জন্য তিনি এলাকাবাসী কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছাত্রলীগের রাজনীতির মাঠ থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা মঈন উদ্দীন খান বাদল ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহবানে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সংগঠক হয়েও সমর যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ- কমোডরদের সাথে নিয়ে অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা ও সফল অপারেশনের মাধ্যমে ৭ টি পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়।

পরে ১৯৭২ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এ যোগদান করেন। রাজপথ থেকে সংসদ সর্বত্রই সমান বিচরণ করা এই মানুষটি তেমন বড় কোন রাজনৈতিক দলের নেতা না হলেও বিশাল কর্মী বাহিনী না থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, মেধা, যোগ্যতা, নেতৃত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে নিজেকে যোগ্য জাতীয় নেতা হিসেবে স্থান করে নিতে পেরেছেন কোটি জনতার হৃদয়ে। মঈন উদ্দীন খান বাদল এক নামেই দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠে। এটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এখনো তার শূন্যতায় কোটি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও আইনজীবি, জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
মোবাইল নং- ০১৭০৯-২৯৯৮৮৮