কেতনা বদল গায়া ইনসান?

0
20

|| কাজী ফেরদৌস || ফেসবুক টাইমলাইন থেকে ||

আপনি যদি অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে থাকেন তাহলে দেখবেন আপনার বিপদে আপদে সরকার, প্রসাশন মিডিয়া এমনকি আইন আদালত সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসবে । যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেলে ও হসপিটালের এসি রুমে মাসের পর মাস আরাম আয়েশে দিন কাটাতে পারবেন। ষাটের দশকে চট্টগ্রামের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আপন ভাই কে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছিলেন।সাথে একজন ডাক্তার ও যিনি আবার আমাদের এলাকার অধিবাসী ছিলেন।গুজব ছিল তিনি প্রায় সারা বছর বাড়িতে থাকতেন।মেহেদী হাসান কে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এনে গজল মাহফিল করতেন এমনকি বাইজী নাচের আসর ও বসাতেন।মাঝে মধ্যে জেলে গিয়ে দুই চার দিন হাজিরা দিতেন। তখন মুখে মুখে এসব গল্প শুনা যেত।মিডিয়া এতো শক্তিশালী ছিল না তখন । সোশাল মিডিয়া বলতে ছিল গুজব আর গালগল্প! তাই অনেক সময় তিলকে তাল করার সুযোগ ও ছিল। এখন আবার মিডিয়া অনেক শক্তিশালী মনে করা হয়। আবার সোসাল মিডিয়া বলে একটা নুতন মাত্রা ও যোগ হয়েছে।তবে মিডিয়াকে যত শক্তিশালী মনে করি না কেন আসলে বাহিরের আবরণ টা যা একটু শক্ত মনে হয় । ভিতরে একেবারে দুর্বল ও অসহায়। এরা এখন রাজনৈতিক শক্তি এবং পুঁজির শক্তির কাছে বশীভূত!দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া গুলো এখন শিল্প ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রণে এবং দেশের রাজনীতির আশি শতাংশ ও এখন তাদের নিয়ন্ত্রনে।সুতরাং এদের সিন্ডিকেটের সামনে সবাই অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য। একটা ভরসা আছে সোশাল মিডিয়া। সেখানে ও আবার এখন অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আরোপিত আছে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের খড়গ!কখন কোন রথী মহারথী আবার ক্ষেপে গিয়ে ফাঁসিয়ে দেয় ভয় আছে।সুতরাং আমার আপনার বা আমজনতার মতামত বা ক্ষোভ প্রশমনের জায়গা এখন খুব সীমিত হয়ে পড়েছে।কাগজে কলমে আমার আপনার বা মিডিয়ার অবাধ স্বাধীনতা আছে । বাস্তবে সবই অদৃশ্য সুতোর বন্ধনে বন্দী। মহা পণ্ডিত দার্শনিক এরিস্টটল মহাশয় প্রায় দুহাজার বছর আগে কি এমনই এমনই বলেছিলেন “যদি আপনার টাকা থাকে তবে আইন আপনার কাছে মুক্ত আকাশের মত।আপনার জন্য হাজারো পথ খোলা থাকবে আইনে কে ফাঁকি দেবার। আর যদি টাকা না থাকে তবে আইন মাকড়সার জালের মতো। আষ্টেপৃষ্টে আপনাকে বেঁধে ফেলবে “! সুতরাং আপনি অপরাধ করবার আগে একবার ভেবে দেখবেন সামাল দিতে পারবেন তো?পারলে এগিয়ে যান।
বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি তানভীর নাকি পালিয়ে গেছে? সোসাল মিডিয়ায় জোর গুজব! এত দ্রুত কি করে পালালো, কেন পালালো বুঝতে পারছি না। আবার দেখি আগাম জামিন চেয়ে আবেদন করেছেন।এত ছোট খাটো বিষয়ে এত বড় বীর পুরুষ এত ঘাবড়ে গেলে কি চলে? আসলে যার মান সম্মান প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি তার হারাবার ভয় থাকে ততো বেশি । যার কিছুই নেই তার কি ভয়?আমি এই শিক্ষা টা পেয়েছিলাম কর্ণফুলীর এক সাম্পান ওয়ালা পাগলা মইত্যা’র কাছে।গোঁয়ার গোবিন্দটার সাথে একবার কোন কারণে আমি একটু কড়া ভাষায় কথা বলে ছিলাম।আর যায় কোথায়! প্রতি উত্তরে সে বলেছিল আমি মইত্যা পাগল!আমি ন্যাংটা! আমার কি মান সম্মান আছে? আমারে তুই হাজার গালি দিলে কি আসে যায়? লাথি মারলে ও কি? তুই তো বড় মওলানা হুজুরের নাতি। তোর মান ইজ্জত আছে। আমি তোরে একটা গালি দিলে তোর মান ইজ্জত থাকবে? তুই তো মানি লোক!তার কথা শুনে ভীষণ লজ্জা পেয়ে পালিয়ে ছিলাম। এর কদিন পর তার সাথে আবার দেখা হলে নিজেই হাত জোর করে আমার কাছে মাফ চায় মইত্যা মাঝি! বড় হুজুরের নাতি তো! একটা ভয় আছে না। যদি বদদোয়া লাগে!তবে সেই থেকে সাবধান হয়ে গেছিলাম।আর তেমন কখনো ভুল হয়নি বাকি জীবনে। মইত্যা মাঝির জ্ঞানগর্ভ বাণী আজীবনের শিক্ষা হয়ে গেল- মানি লোক কে মান রক্ষা করে চলতে হয়!
এখন অবশ্য মূল্যবোধের প্যাটার্ন পাল্টে গেছে। প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিকরা আমাদের সনাতনী মধ্য বিত্তের মূল্য বোধ নিয়ে আর তেমন মাথা ঘামায় না।এখন তাঁদের মানসম্মানের বর্ম অনেক শক্ত। সহজে সেটা নষ্ট হয়না। তাঁরা দিন কে রাত করতে পারে রাতকে দিন । চুরি করে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে। ধর্ষণ রাহাজানি করে উল্টো বড় গলায় ধোয়া তুলসীপাতা দাবি করতে পারেন। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলে চিৎকার করে তোলপাড় করতে পারেন! এসব ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব টা এখন খুব যুতসই অস্ত্র।তাদের সহযোগিতা করার জন্য সবাই এগিয়ে ও আসেন।মিডিয়া বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক আইন আদালত সব আছে। সব অভিযোগ থেকে বাইজ্জত রেহাই পেয়ে বেরিয়ে আসবে কোন একসময় । সবাই বলবে অমুক ভাই এর চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র! হয়তো দেখা যাবে কোন ক্ষতিগ্রস্হ নারী বেশ্যায় পরিনত হয়ে যাবে! কোন ভুক্তভোগী মানুষ চোর বাটপার হয়ে গেছে!
গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তোলপাড় করা মুনিয়া নামক এক মেয়ের কথিত আত্মহত্যার ঘটনা টা পর্যবেক্ষণ করছি আর ভাবছি পৃথিবী টা কত বদলে গেছে।
দুজন নামীদামী সাংবাদিকের মন্তব্য পড়লাম বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি তানভীর কে নিয়ে। একজন তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছায় লিখেছেন তাঁর হৃদয় নাকি হিমালয় সম উঁচু এবং উদার। আর একজন লিখেছেন তাঁর কলিজা এত বিশাল মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বিস্তৃত? আসলে রতনে রতন চিনে।আমাদেরই শুধু ভুল হয়।আমরা সাধারণ মানুষ আদার ব্যাপারী। শুধু শুধু জাহাজের খবর নিয়ে মাথা ঘামাই।

আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন – আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। দোষ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। খুব খুশির খবর। তবুও কেন যেন আস্বস্ত হতে পারিনা? কারণ এদেশে আইনের নিজস্ব গতি বলে কিছু দেখিনা। সবসময় পেছন থেকে ধাক্কা না দিলে কোন গতি সঞ্চার হয়না। তাইতো ত্বকী হত্যা মামলার কোন কূল কিনারা হয়না আট বছরেও। সাগর রুনি হত্যা, মাহমুদা মিতু হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যা মামলা সব হিমাগারে চলে গেছে। সুতরাং আস্বস্ত হই কি ভাবে?

পৃথিবী টা আসলে আমাদের বয়স কালেই এত পাল্টে গেল কি করে? এখন মাঝে মাঝে কষ্ট হয় চিনতে। কারণ বদলে গেছে ধ্যানধারনা, বদলে গেছে অনেক মূল্যবোধ।আগে আমরা বলতাম মানীর মান আল্লায় রাখে।এখন মনে হয় এগুলো দুর্বল ও অসহায় লোকের বিশ্বাস। কারণ এখন যারা ধনদৌলতে শক্তি মান তাঁরা মনে করে মানীর মান টাকায় রাখে।আবার তাদের মান-মর্যাদা এতো ঠুনকো ও নয়। তাই সহজে নষ্ট হয়না, ক্ষুন্ন ও হয়না।
মাঝে মাঝে ভাবি পৃথিবী টা কি সত্যি বদলে গেছে নাকি আমাদের মন মানসিকতা ও চিন্তা ধারা ও মূল্যবোধ বদলে গেছে?
১৯৫৪ সালে নাস্তিক ছবিতে কবি প্রদীপের গাওয়া পুরনো হিন্দি গানটি কি মনে আছে? – চাঁদ না বদলা সুরজ না বদলা না বদলারে আসমান,
কেতনা বদল গায়া ইনসান…..! আসলে পৃথিবী বদলায় নি। বদলে গেছে মানুষ আর তার নিজের মূল্যবোধ।

নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম
২৯/৪/২০২১