চট্টগ্রামসহ সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট নিয়ে যা জানা যাচ্ছে

0
4

ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যেই দেশে তীব্র হচ্ছে গ্যাস সংকট। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সর্বত্রই যার প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এমন পরিস্থিতির মধ্যে কমেছে উৎপাদন। সেই সঙ্গে বেড়েছে আমদানি নির্ভরতা।

গত ক’দিন ধরেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গ্যাসের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে কারিগরি ত্রুটির কারণে শুক্রবার (১৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম এলাকায় সকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে জনভোগান্তি বেড়েছে।

অবশ্য, আসন্ন রমজানের আগেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে গ্যাস সংকট চলছে, তা লাঘব হবে বলে আশার বার্তা দিয়েছেন তৃতীয় মেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অগ্রগতি, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এমনটাই আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে জ্বালানি স্বল্পতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ৫টি ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ডলার সংকটের ফলে অতিরিক্ত আমদানিও করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে আগামীতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূর্ণ করাই হবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে দেশে গ্যাসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, গৃহস্থালি, সিএনজিসহ মোট সাতটি সেক্টরে গ্যাসের মোট চাহিদা দাঁড়াবে ৩ হাজার ৭১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে সংস্থাটির হিসেবেই বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি।

Advertisement

যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, গ্যাসের ঘাটতি প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

এদিকে সরকারি হিসেব বলছে, চলতি বছর গরমে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজন হবে তেল, গ্যাস ছাড়াও বিপুল পরিমাণ কয়লা।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিসহ জ্বালানির জন্য ব্যয় করতে হয়েছে ৬১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। এই অবস্থায় জ্বালানি সংকট না কাটলে উৎপাদন বাড়ারও কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. তামিম বলেন, নিত্যদিন আমাদের উৎপাদন কমে আসছে। মাঝখানে কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা হলেও কিছুটা ফল আসে, কিন্তু অন্যান্য জায়গায় কমেছে নেট উৎপাদন।

এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, আমদানির ক্ষেত্রেও একটা স্থবিরতা আছে। এই মুহূর্তে কোনো স্বল্পকালীন সমাধান নেই। ডলারের সংকট না কাটলে এই জ্বালানি সংকটের স্বল্পকালীন কোনো সমাধান নেই।

জ্বালানি সংকট এমন তীব্র হওয়ার নেপথ্যের কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, গতবছর তেল, গ্যাস ও কয়লা মিলিয়ে ১৩-১৫ বিলিয়ন ডলার (আমদানি) লেগেছে। এ বছর জ্বালানির দাম একই থাকলে প্রতি মাসে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার লাগবে। অর্থাৎ এক বছরে ১৮ বিলিয়ন লাগতে পারে। এই বিষয়টিই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

তার কথায়, ‘আমাদের তো শুধু জ্বালানি আমদানি করলেই হবে না। শিল্প কারখানা চালাতে গেলে কাঁচামাল টোটাল আমদানির যে চাপ সেটা তো আছেই। সেখানে জ্বালানি অতিরিক্ত চাপ চলে এসেছে। কারণ আমাদের জ্বালানি পুরো পরিকল্পনাটাই আমদানি নির্ভর হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে ডলারের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে। এদিকে, বর্তমান সময়ের সংকটের কারণে চলতি বছর জ্বালানি চাহিদা পূরণ আরও চ্যালেঞ্জিং হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জার দাবি, আমদানি নির্ভর হওয়ায় এমন পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাকে এটা পুরো ডলারে পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং আপনারা জানেন যে আমাদের ডলারের যে রিজার্ভ, আমাদের সেটা কমে আসছে খুবই আশঙ্কাজনকভাবে। এখনই কিন্তু আমি বিল পরিশোধ করতে পারছি না।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা