পিসিটিতে ৪৮ ঘন্টায় এক হাজার ৪১৩ টি কন্টেইনার উঠানামা করেছে রেড-সি গেটওয়ে

0
9

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, চট্টগ্রাম :: পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) ৪৮ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪১৩টি একক কন্টেইনার ওঠানামা করেছে সৌদি আরবভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেইটওয়ে’। চট্টগ্রাম বন্দরের কোন কৃতিত্ব ছাড়াই এবং বন্দরের কোন রকম টেকনিক্যাল সাপোর্ট ছাড়াই এ সাফল্য দেখিয়েছে বিদেশী বন্দর পরিচালনা প্রতিষ্ঠান রেড-সি গেটওয়ে।

বিদেশি অপারেটরের অধীনে পিসিটিতে প্রথমবার ভেড়ে ‘মায়ার্সক ডাভাও’ কন্টেইনার জাহাজ। সোমবার বিকালে জাহাজটি ভেড়ে, আর বুধবার বিকালে জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যায়। সে হিসেবে ৪৮ ঘণ্টায় ওই পরিমাণ কন্টেইনার ওঠানামা করেছে।

পিসিটিতে এখনও জাহাজ থেকে কন্টেইনার ওঠানামার আধুনিক যন্ত্র গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অনেক যন্ত্র যোগ হয়নি। তাই জাহাজের নিজস্ব ক্রেন দিয়েই ‘মায়ের্সক ডাভাও’ থেকে কন্টেইনার ওঠানামা করা হয়েছে। ফলে কন্টেইনার ওঠানামা স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়েছে।

পিসিটিতে আমদানি কন্টেইনার নামানোর অনুমতি দিলেও স্ক্যানার মেশিন স্থাপন, রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন সিস্টেম অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সাথে সংযোগ, বন্দরের সিটিএমএস কার্যক্রমের সাথে সিনক্রোনাইজেশন, কাস্টমস অফিসসহ সব সেটআপ এখনও কাজ শুরু করেনি। ফলে আপাতত রপ্তানি কন্টেইনার জাহাজীকরণ করেই কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘রেড সি গেইটওয়ে’ কর্তৃপক্ষ। এই কারণে ‘মায়ের্সক ডাভাও’ জাহাজে শুধু রপ্তানি কন্টেইনার জাহাজীকরণ করা হয়েছে।

ড্যানিশভিত্তিক বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ শিপিং কোম্পানি মায়ের্সক লাইনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “৪৮ ঘণ্টায় আমরা ১ হাজার ৪১৩ একক কন্টেইনার ‘মায়ের্সক ডাভাও’ জাহাজে তুলতে পেরেছি। সোমবার বিকাল থেকে কন্টেইনার ওঠানামা শুরু হয়, আর বুধবার বিকাল চারটা ৪০ মিনিটে জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যায়। এই সময়ে ৯১৫ একক রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার ও ৪৯৮ একক খালি কন্টেইনার হ্যান্ডল করা হয়। প্রথম জাহাজ হিসেবে এটা অনেক ভালো হ্যান্ডলিং ছিল।”

তবে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী এক বিদেশি শিপিং লাইন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “পিসিটির সাথে জিসিবি বা এনসিটির কন্টেইনার ওঠানামার তুলনা করা কিংবা আত্নতৃপ্ত হওয়ার মতো সময় এখনও আসেনি। কারণ দুটি টার্মিনালের পণ্য ওঠানামার ধরন ভিন্ন। পিসিটিতে এখনও গ্যান্ট্রি ক্রেন লাগেনি, আাবার এনসিটিতে গ্যান্ট্রি ক্রেন আছে। আবার জিসিবির সাথে তুলনা করা যাচ্ছে না, কারণ জিসিবিতে রপ্তানি কন্টেইনার রাখার মতো এত স্থান নেই।”

তিনি বলেন, “এরপর আমরা যদি জিসিবির সাথে মেলাই তাহলে দেখব পিসিটি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষমাত্রায় কন্টেইনার ওঠানামা করতে পারেনি। কারণ মায়ের্সক লাইনের রপ্তানি কন্টেইনার আগে থেকেই ইয়ার্ডে জমা ছিল। ফলে রপ্তানি কন্টেইনার জাহাজের নিজস্ব ক্রেন দিয়ে জাহাজীকরণ করতে খুব বেগ পেতে হয়নি।

“এরপরও আমি বলব, জাহাজীকরণ কিছুটা কম হয়েছে। জিসিবিতে এত কন্টেইনার রাখার স্থান নেই। এজন্য আমরা দেখি সকালে জাহাজ বন্দর ছাড়বে আর রাতেই কন্টেইনার ইয়ার্ডে পৌঁছেছে। তবে আমরা আশা করব, পরবর্তী জাহাজগুলোতে কন্টেইনার ওঠানামা বেশি হবে।”

বন্দর ব্যবহারকারীদের হিসাবে, বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবিতে ৭২ ঘণ্টায় একটি কন্টেইনার জাহাজ আমদানি পণ্য নামিয়ে রপ্তানি পণ্য তুলে বন্দর ছাড়ে। সে হিসেবে জিসিবিতে ৭২ ঘণ্টায় ২৭শ একক কন্টেইনার ওঠানামা হয়। অর্থাৎ দিনে গড়ে কন্টেইনার ওঠানামা করার কথা ৯শ একক। কিন্তু পিসিটিতে সেটি হয়েছে ৭শ একক কন্টেইনার।

তবে পিসিটি পরিচালনাকারীরা বলছেন, “প্রথম জাহাজ হিসেবে এখানে কাজটি অভ্যস্ত হওয়া বা বুঝে ওঠার বিষয় ছিল। ধারাবাহিকভাবে পণ্য ওঠানামা বেড়ে যাবে। কারণ জিসিবিতে আমরা একই ধরনের জাহাজ ভিড়িয়ে কন্টেইনার ওঠানামা করেছি।”

সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা শুরু করেছে সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেইটওয়ে’। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনও বিদেশি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনার কাজ শুরু করল।

চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, পায়রা সমুদ্রবন্দরে কেবল দেশি প্রতিষ্ঠানই পণ্য ওঠানামা বা পরিচালনার কাজ এতদিন করে আসছিল। এই প্রথম আর্ন্তজাতিক কোনও অপারেটর এই কাজে যুক্ত হল। একে মাইলফলক হিসাবে দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের পরিচালন কাজের সঙ্গে বিদেশি বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে। দেশি অপারেটররা নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চাপে পড়বে।

২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পিসিটি নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে পিসিটি নির্মাণ করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নির্মাণ কাজ করে।

২০২২ সালের মাঝামাঝি নির্মাণকাজ শেষ হলেও নানা কারণে চালু হয়নি এই টার্মিনাল। অবশেষে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে লিমিটেডের সঙ্গে গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি সম্পাদনের পর তাদের এই টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরু করতেই ছয়মাস লাগল।

পিসিটি টার্মিনালে মোট তিনটি কন্টেইনার জাহাজ ভেড়ার জেটি আছে; যার দৈর্ঘ্য ৫৮৪ মিটার। এছাড়া একটি ২০৪ মিটারের তেল খালাসের ডলফিন জেটি, ৮০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মিত হয়েছে। এই জেটি ২০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। সব সরঞ্জাম সংগ্রহ করে পিসিটি পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে আরও এক বছর সময় লাগতে পারে। শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করবেরেড সি গেটওয়ে লিমিটেড। আর চুক্তিমতো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মাশুল পাবে।