সাতকানিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চিকিৎসক হেনস্তার শিকার

0
51

চট্টগ্রামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করেই গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া এলাকায় চেম্বার গড়েন ডা. ফরহাদ কবির। পৌরসভার বেসরকারি আলফা হাসপাতালের পাশাপাশি নাছির ফার্মেসি ও মক্কা ফার্মেসিতে নিয়মিত রোগী দেখেন তিনি। লকডাউনের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২ জুলাই) মক্কা ফার্মেসিতে চেম্বার করতে যাওয়ার পথে তল্লাশির মুখে পড়েন সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলামের চেকপোস্টে।

মোটরসাইকেলযোগে চেম্বারে যেতে থাকা ডা. ফরহাদকে সঙ্কেত দিয়ে থামান ইউএনওর সঙ্গে থাকা লোকজন। এরপর মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নিয়ে ফরহাদকে ইউএনওর কাছে নেয়া হয়। ইউএনও ডা. ফরহাদের পরিচয় জেনেও তাকে জরিমানা করেন। এ নিয়ে সাতকানিয়াসহ চট্টগ্রামে আলোচনার ঝড় বইছে।

গত শুক্রবারের (২ জুলাই) এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চিকিৎসক ডা. ফরহাদ কবির পরদিন শনিবার (৩ জুলাই) নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে তিনি হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. ফরহাদ কবির বলেন, ‘আমি গত শুক্রবার আসরের নামাজ শেষে মক্কা ফার্মেসিতে একজন রোগী আসার খবরে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলাম। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আমি মোটরসাইকেলের হেলমেট, মানিব্যাগ ও পরিচয়পত্র নিতে ভুলে যাই। সাতকানিয়া কলেজের সামনে যেতেই ইউএনওর সঙ্গে থাকা লোকজন আমাকে থামানোর সঙ্কেত দেন। আমি গিয়ে ইউএনওকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে কথা বললাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউএনও শুরুতে লকডাউনে কেন বের হয়েছেন জানতে চেয়ে আমাকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলেন। জবাবে আমি বলেছি পরিচয়পত্র আমার সঙ্গে নেই। তাহলে বের হয়েছেন কেন জানতে চাইলে আমি বলি—আমরা তো বিধিনিষেধের আওতামুক্ত৷ তাছাড়া আমরা বের না হলে রোগীদের চিকিৎসা দেবেন কে? এই কথা বলার পর তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন—‘এতো কথা বলেন কেন? আপনাকে চাইলে আমি জেলে পাঠাতে পারি। কিন্তু আপনাকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হলো’। এদিকে মানিব্যাগ বাসায় ফেলে আসায় আমার পকেটে এক হাজার টাকার বেশি ছিল না। বিষয়টি জানালে ইউএনও বলেন—‘ঠিক আছে তাহলে এক হাজার টাকা জরিমানা দেন’।’

ডা. ফরহাদ কবির আরও বলেন, ‘জরিমানা ধার্যের পর ইউএনও আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তাতেই সবচেয়ে বেশি অপমানবোধ করেছি। তিনি আমাকে মাস্ক নামাতে বলেন। আমার ছবি তুলে নাকি পত্রিকায় দিতে হবে, যেন লোকজন জানে—চিকিৎসককে জরিমানা করা হয়েছে। এরপর কয়েকজন সাংবাদিক এসে আমার ছবি তুললেন। তাছাড়া ইউএনও মামলার কাগজ লেখার সময় বলেন—ডা. ফরহাদ কবির লিখতে বলেন, যেন লোকজন জানতে পারে চিকিৎসককে জরিমানা করা হচ্ছে।’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলার ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার দিন ওই চিকিৎসকের মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট কিছুই ছিল না। তাছাড়া তার পরিচয়পত্রও ছিল না। তাকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি নিজেই ভুল স্বীকার করে জরিমানা করতে বলেন। পরে তাকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এখন এটা নিয়ে দেখি ঝামেলা তৈরি হয়ে গেল।’

অবশ্য ইউএনও ডা. ফরহাদ কবিরের মোটরসাইকেলের হেলমেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার বিষয় বললেও জরিমানার কাগজে অপরাধ দেখানো হয়েছে—দণ্ডবিধির ২৭০ ও ২৭১ ধারায়।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইন অনুযায়ী ২৭০ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো বিদ্বেষমূলক কার্য করে, যা জীবন বিপন্নকারী মারাত্মক কোনো রোগের সংক্রমণ বিস্তার করতে পারে এবং সে কার্য করার দরুণ যে অনুরূপ রোগের সংক্রমণ বিস্তার হতে পারে তা জানা সত্ত্বেও বা বিশ্বাস করার কারণ সত্ত্বেও তা করে, তবে সে ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থ দণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।’

২৭১ ধারায় উল্লেখ করা হয়, ‘কোনো জাহাজ বা জলাযানের ওপর কোয়ারেন্টাইন আরোপের জন্য অথবা যেসব জলযানের ওপর কোয়ারেন্টাইন আরোপ করা হয়েছে, অপর কোনো জাহাজের বা তীরভূমির সঙ্গে তাদের সংযোগ সম্পর্কে, অথবা যেসব স্থানে সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ দেখা দিয়েছে, সেসব স্থানের সঙ্গে অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ সম্পর্কে, সরকার দ্বারা প্রণীত ও জারিকৃত কোনো বিধি বা নিয়ম কোনো ব্যক্তি যদি জ্ঞাতসারে অমান্য করে, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। ইতোমধ্যে বিভাগীয় কমিশনার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, জেলা প্রশাসকসহ সবাই বিষয়টি অবগত আছেন। আশা করি, একটি সুন্দর সমাধান হবে।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, ‘সাতকানিয়া ইউএনওর বিরুদ্ধে অশোভন আচরণের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি নিজে প্রতিদিন সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বলি, চিকিৎসক তো দূরের কথা কোনো সাধারণ মানুষের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করা যাবে না।’

ভাইরাল থুতনিতে মাস্ক পরে কার্যক্রমের ছবি
এদিকে গত বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) শুরু লকডাউনের প্রথম দিনে সাতকানিয়া উপজেলা ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলামের থুতনিতে মাস্ক পরে সড়কে কার্যক্রম পরিচালনার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ছবিতে সঙ্গে থাকা সবাই সঠিকভাবে মাস্ক পরলেও ইউএনওকে থুতনিতে মাস্ক পরতে দেখা যায়। পরে ছবিটি নিয়ে চট্টগ্রামজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও অ্যাডভোকেট এসএম দিদার উদ্দিন বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ইউএনও যদি থুতনিতে মাস্ক পরে থাকেন, তিনি অন্যায় করেছেন। পাশাপাশি নিজে দৃশ্যমান আইন লঙ্ঘন করায় তখন তার বিচারিক ক্ষমতা ছিল কি-না সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এএইচএম জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘বিচারক যদি আইন লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলে তাকে দেখে লোকজন কী শিখবে? তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’

অবশ্য ওই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা ইউএনও বলেন, ‘হয়তো মোবাইলে কিংবা এমনি কথা বলার কারণে মাস্ক থুতনিতে পরা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি আমার ভুল হয়েছে। আমাকে শাস্তি পেতে হবে আর কী।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, ‘কোনো অবস্থায় মাস্ক না পরার সুযোগ নেই এবং তা সঠিকভাবে পরতে হবে। যেমন আমার পাশে এখন তেমন কেউ নেই। তারপরও আমি মাস্ক পরে আছি। ইউএনও হিসেবে তিনি যদি সঠিকভাবে মাস্ক না পরেন তবে বিষয়টি আমি খোঁজ নিচ্ছি। তদন্তপূর্বক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গত বৃহস্পতিবার ১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এ সময় জরুরিসেবা দেয়া দফতর-সংস্থা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিস, যন্ত্রচালিত যানবাহন, শপিংমল-দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মীসহ জরুরি সেবা-সংশ্লিষ্টরা এই বিধিনিষেধের আওতামুক্ত।