হুমকিতে হালদার জীববৈচিত্র্য

0
33

মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে পানি সরবরাহের জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। মোহরা পানি শোধনাগার ফেস-২ নামে দৈনিক ১৪ হাজার কোটি লিটার উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন ওই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রকল্পের জন্য বিবিধ খাতে ব্যয়ের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বাজেট করা হয়েছে বলে জানা যায়।

ওয়াসার ওই প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইটিএ) যাচাইয়ের দায়িত্ব পড়ে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) ওপর। তারা বেশ কিছুদিন নতুন এই প্রকল্প ঘিরে হালদা নদীর পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করে। পরে ১৮৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি। তাদের সেই প্রতিবেদনে হালদার পরিবেশগত কোনো সমস্যা না থাকায় ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে পাঠায় ওয়াসা।

এরপর প্রতিবেদনটির ওপর গত বছরের নভেম্বরে পরিবেশ অধিদফতর কার্যালয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হালদা নদী নিয়ে কাজ করা একাধিক গবেষক। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হলে সেই প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি তোলেন কয়েকজন হালদা বিশেষজ্ঞ।

jagonews24.com

তারা বলেন, আইডব্লিউএমর তৈরি করা রিপোর্ট মূলত আগের রিপোর্টের কপি। নতুন করে নদীতে কোনো সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়নি। আবার রিপোর্ট তৈরিতে ছিলেন না কোনো বিশেষজ্ঞ। তাই তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে মনগড়া প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে বলে একাধিক বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ড. মনজুরুল কিবরিয়া। তিনি তার বক্তব্যে প্রতিবেদনটির ১৩ পয়েন্টে দ্বিমত পোষণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিরোধিতা করেন। সেমিনারে তার দেয়া যুক্তি হলো- হালদা নদী থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রস্তাবিত প্রকল্পসহ প্রতিদিন ৫৬.১ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের পরও রিপোর্টে দেখানো হয়েছে ২.০৫ শতাংশ পানি উত্তোলন করা হবে। অথচ ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক চট্টগ্রামের একটি দৈনিকে ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর তারিখের সাক্ষাৎকারে নিজে বলেন ৩.৫ শতাংশ পানি উত্তোলন করা হবে। আবার আইডব্লিউএমর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী হালদার মোহরা অংশে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে পানি দেখানো হয়েছে ১৬০০-২১৫০ এমএলডি (মিলিয়ন অব লিটার পার ডে) যার গড় পরিমাণ ১৮৭৫ এমএলডি। একই সময়ে নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হবে ৫৬১ এমএলডি। ঐকিক নিয়মে নদী থেকে পানি উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯.৯২ শতাংশ। অর্থাৎ নদীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি উত্তোলন করা হবে।

যদিও আইডব্লিউএমর বক্তব্য হচ্ছে- হালদায় পানি কমে গেলে বাকি পানি কর্ণফুলী নদী থেকে পূরণ করা হবে এবং হালদায় মাছ ডিম ছাড়ে বর্ষাকালে। এমন বক্তব্যের যুক্তিতে ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘হালদায় বর্ষাকালে মাছ ডিম ছাড়লেও ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস হলো মাছের প্রজননের পূর্ববর্তী সময় বা প্রি স্পনিং টাইম। এমন সময় মাছের গুণগত মানের পানি ও প্রচুর পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। এ সময় পানির সংকট হলে কিংবা কর্ণফুলী থেকে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করলে হালদার জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হবে।’

আবার আইডব্লিউএমর রিপোর্টে বলা হয়েছে- হালদা থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করা হলেও মাছের স্বাভাবিক প্রজননে সমস্যা হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ড. মনজুর বলেন, ‘কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা তথ্য-উপাত্ত ছাড়া এমন বক্তব্য দেয়া হয়েছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়নি কী পরিমাণ পানি থাকলে হালদা প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের উপযুক্ত থাকবে। আবার স্তন্যপায়ী প্রাণী ডলফিনের জন্য কী পরিমাণ পানি প্রয়োজন তার কিছুই প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। শুধু বাজার থেকে মাছের ছবি তুলে দিয়ে বলা হয়েছে মাছের প্রজননের কোনো সমস্যা হবে না। অথচ হালদার কোনো মাছ বাজারে পাওয়া যায় না।